বিয়ে করেছিলাম জমিদার বংশের কন্যাকে। ভালোবাসার বিয়ে নয়, বিয়ে করে ভালোবেসে ছিলাম। আমাদের দাম্পত্য জীবনের সাতাশ বছর পার হয়েছে গত বছরের ১ নভেম্বর। আমার দাদা-শ্বশুর ছিলেন জমিদার। কিন্তু তার চার ছেলের কেউ জমিদারির অংশ বিশেষও ধরে রাখতে পারেননি। তবে জমিদারের রক্তের ধারা বইছে দাদা শ্বশুরের নাতি-নাতনিদের ধমনিতে। আমার স্ত্রী তাদের অন্যতম।
জমিদারের স্বভাব হুকুম করা, কারো হুকুম বা অনুরোধ মান্য করা নয়। সেই ধারা অনুযায়ী আমার স্ত্রীকে হুকুম করলে মনঃক্ষুণ হয়। কিন্তু সে যা আদেশ করে তা কেউ অমান্য করলে তার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়।
যাহোক, আমার চাকরি জীবন পাঁচ বছর অতিক্রম করার পর বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের পর থেকেই স্ত্রীকে ভালোবাসতে শুরু করেছি। অস্বীকার করবো না, সেও আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়েছে। সাংসারিক কাজে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। আমাকে না খাইয়ে সে খায় নি। আমার খাবার সময় আমার পাশে বসে খাওয়া তদারক করেছে। কোথাও গিয়ে ফিরতে দেরি হলে সে চিন্তিত হয়ে পড়তো।
সে সঞ্চয়ী মনোভাবাপন্ন। সংসার খরচের টাকা থেকে কিছু সঞ্চয় করে রাখতো। আমি টাকার সমস্যায় পড়লে তার সঞ্চিত অর্থ থেকে দ্বিধাহীন ভাবে আমাকে দিত। দীর্ঘ সাতাশ বছরে ওই অর্থের পরিমাণ কতো হবে সেই হিসাবটাও কখনো করিনি। দাম্পত্য জীবনে আমরা খুবই সুখী।
ইংল্যান্ডের এক মহিলা কবি হেনরিয়েটার কথা শুনেছি। তাদের দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয়েছিল ছাপ্পান্ন বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তারা স্বামী-স্ত্রী কখনো আলাদা বিছানায় ঘুমাননি। আমরাও স্বামী-স্ত্রী অনুরূপ দিন কাটিয়ে আসছি।
আমাদের দাম্পত্য জীবনের একটু ব্যতিক্রম ঘটতে লাগলো, আমি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে। আমার কথা তার ভালো লাগে না। আমার আর তার ভালোবাসাটা ক্রমেই কমছে। তাহলে কি ওই কথাটাই সত্যি হতে চলেছে, অভাব দরজা দিয়ে ঢুকলে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়।
দুপুরের রান্না শেষ করতে প্রায় দেরি হয়। ফলে অনেক দিনই জোহরের নামাজ বাদ পড়ে যায়। তা দেখে বলেছি রান্নার পরিমাণ কমিয়ে জোহর নামাজ সময় মতো পড়তে। আরো উপদেশ দিয়েছি গোসল, খাওয়া ও নামাজ সময় মতো পড়লে সংসার আর বাকি কাজগুলো সহজেই সমাধা হয়ে যাবে।
আমার উপদেশের কোনো গুরুত্ব তার কাছে নেই। রাতে শোবার সময় তাকে কাছে পেতে বেশ দেরি হয়। আমি অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে যাই। সে গভীর রাতে যখন শুতে আসে তখন তার ভারী শরীর বিছানায় পতনের শব্দে আমার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যায়।
ওর আবার শরীর চুলকানোর ব্যামো আছে। প্রতি রাতে কাঁচা ঘুম ভেঙে ওর পিঠ চুলকিয়ে দেওয়া লাগে আমার। যেহেতু জমিদার নাতনির আদেশ সেহেতু বাধ্য স্বামীর মতো আদেশ পালন করতে হয়।
এখন আবার তিন বেলা খাবার টেবিলে তাকে পাই না। টেবিলে খাবার দেয়া থাকে, আমাকে একাই খেতে হয়। গৃহস্থ বাড়িতে রাখালিরা যেভাবে খাবার খায়, অনুরূপ। রাখালিদের সামনে কেউ বসে খাওয়া তদারক করে না। গৃহস্থ বাড়ির ভেতর থেকে খাবার আনে, আর তারা বাইরের ঘরে বসে খায়। আমার বাসায় বাইরের ঘর নেই। ডাইনিং রুমটাই খাবার ঘর হিসেবে ধরি।
সম্প্রতি প্রস্তাব এসেছে, আলাদা বিছানায় শোয়ার। কিন্তু বাসায় রুম স্বল্পতার কারণে সেটা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। ভয়ে আছি না জানি কবে ডাইনিং এ বিছানা পাতানো হয় আমার জন্য।
চাকরির অবসরের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভালোবাসাটাও শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। পুরুষ মানুষ যতদিন রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারে, ততদিন সবার কাছে ভালবাসার পাত্র হয়ে থাকে। যবে থেকে ভাটা পরে, তখন থেকে শুরু হয় অবহেলা।
মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে খুব হেনরিয়েটার মতো জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এক হয়ে থাকতে। কতটুকু পারবো জানি না, তবে উভয়ের চেষ্টা থাকলে হয়তো আবারও প্রথম দাম্পত্য জীবনের মতো হতে পারবো।
সমাপ্ত
অবসর এবং অবহেলা
তানভীর আহমেদ